বৌদ্ধধর্মে রাজন্যবর্গের অবদান: সম্রাট অশোক (একাদশ অধ্যায়)

বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

535

অশোক ভারতবর্ষের বিখ্যাত সম্রাট ছিলেন। তিনি প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষ আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৮ অব্দ থেকে ২৩২ অব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী সম্রাট ছিলেন। ভারতবর্ষ এবং বহির্বিশ্বে তাঁর অপরিসীম প্রভাব ছিল। তাঁর রাজ্যসীমা-পশ্চিম দিকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান পর্যন্ত, পূর্ব দিকে বাংলাদেশ ও আসাম এবং উত্তর-দক্ষিণ দিকে কেরালা ও অন্ধ্র প্রদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তিনি কলিঙ্গ রাজ্যও জয় করেন। তাঁর রাজধানী ছিল মগধ। মগধ বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যে অবস্থিত। কলিঙ্গ যুদ্ধের বিভীষিকা দেখে তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারে তিনি অপরিসীম অবদান রাখেন। অহিংসা, ভালোবাসা, সত্য, ন্যায় ও সহিষ্ণুতা ছিল তাঁর আদর্শ। শান্তিকামী এবং ধার্মিক রাজা হিসেবে তাঁর খুবই সুখ্যাতি ছিল। ধর্ম ও ন্যায়ের সঙ্গে তিনি রাজ্য শাসন করতেন। জনহিতৈষী শাসন ব্যবস্থার জন্য তিনি বিশ্বের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ নৃপতি হিসেবে অমর হয়ে আছেন। এ অধ্যায়ে আমরা সম্রাট অশোক সম্পর্কে পড়ব।

এ অধ্যায় শেষে আমরা -

  • সম্রাট অশোকের পরিচয় বর্ণনা করতে পারব।
  • বৌদ্ধধর্মের প্রচার প্রসারে সম্রাট অশোকের কৃতিত্ব মূল্যায়ন করতে পারব।
  • সম্রাট অশোকের আদর্শ ব্যাখ্যা করতে পারব।
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও

রণজিৎ মিত্র একজন ইতিহাসবিদ। তিনি তার ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠদানকালে বলেন, ইতিহাসে এমন এক সম্রাটের কথা বলা হয়েছে, যার জীবনের একমাত্র ব্রত ছিল প্রজাদের কল্যাণ সাধন। এবং তিনি ছিলেন বুদ্ধধর্মের অনুসারী। কিন্তু তাঁর রাজত্বকাল ছিল মাত্র ছত্রিশ বছরের। তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ২৩২ অব্দে মৃত্যুবরণ করেন।

খ্রিষ্টপূর্ব (২৬৮-২৩০) অব্দ পর্যন্ত
খ্রিষ্টপূর্ব (২৬৮-২৩২) অব্দ পর্যন্ত
খ্রিষ্টপূর্ব (২৭৮-২৪০) অব্দ পর্যন্ত
খ্রিষ্টপূর্ব (২৭৮-২৪২) অব্দ পর্যন্ত

অশোক ভারতের মৌর্যবংশে জন্মগ্রহণ করেন। রাজা বিন্দুসার ছিলেন তাঁর পিতা। মৌর্যবংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত ছিলেন তাঁর পিতামহ। তাঁর মাতার নাম নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। অশোকাবদান গ্রন্থ মতে, তাঁর মাতার নাম সুভদ্রঙ্গী। দিব্যাবদান গ্রন্থ মতে জনপদকল্যাণী। অশোক নামকরণের একটি সুন্দর কাহিনি প্রচলিত আছে। কথিত আছে, ষড়যন্ত্র করে অশোকের মাতাকে পিতা বিন্দুসারের কাছ হতে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। ফলে তাঁদের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এতে অশোকের মাতা খুবই কষ্ট ভোগ করেন। তাঁদের মধ্যে পুনরায় সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয় এবং রানি এক পুত্রসন্তান জন্মদান করেন। খুশি হয়ে তখন তিনি বলেন, এখন আমি শোকহীন, এজন্য পুত্রের নাম রাখা হয় অশোক। অশোকের অনেক সৎ ভাই ছিল।

অশোক ছিলেন খুবই বুদ্ধিমান এবং সাহসী। কথিত আছে, তিনি একটি বাঘকে কাঠের আঘাতে হত্যা করেছিলেন। ছোটবেলায় তাঁকে যুদ্ধবিদ্যা শেখানো হয়। অল্পদিনের মধ্যে তিনি যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শীতা অর্জন করেন। দুঃসাহসী কাজ করতে তিনি খুবই পছন্দ করতেন। তিনি ভয়ংকর এবং নির্দয় যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

তাই তাঁকে অবন্তীতে দাঙ্গা নিরসনের জন্য প্রেরণ করা হয়েছিল। রাজা অমাত্যদের বিদ্রোহ দমনের জন্য উজ্জয়িনীতে তাঁকে শাসনকর্তা হিসেবে নিয়োজিত করা হয়। তিনি সেখানে শৌর্য বীর্যের পরিচয় দিয়ে বিদ্রোহ দমন করেন।

পিতা বিন্দুসারের মৃত্যুর পর সম্রাট অশোক সিংহাসনে আরোহণ করেন। কথিত আছে যে, তিনি সিংহাসনে আরোহণের জন্য ৯৯ জন ভ্রাতাকে হত্যা করেন। প্রথম দিকে সম্রাট অশোক বদমেজাজি এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির রাজা ছিলেন। তিনি প্রজাদের খুব নির্যাতন করতেন। সিংহাসনে আরোহণ করার পর থেকে তিনি রাজ্য বিস্তারের নেশায় মত্ত থাকতেন। তিনি বিভীষিকাময় এক যুদ্ধে কলিঙ্গ জয় করেন। কলিঙ্গ ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যে অবস্থিত। কথিত আছে, কলিঙ্গ যুদ্ধে দেড়লক্ষ লোককে বন্দী করা হয়েছিল। এক লক্ষ লোককে হত্যা করা হয়েছিল এবং অসংখ্য লোক আহত হয়েছিল। এরূপ নিষ্ঠুর প্রকৃতির স্বভাবের জন্য তিনি 'চণ্ডাশোক' নামে পরিচিত ছিলেন। তখন তিনি তীর্থিক সন্ন্যাসীদের ভক্ত ছিলেন।

অনুশীলনমূলক কাজ
'অশোক' নাম কেন রাখা হয়েছিল? সম্রাট অশোক কীভাবে সিংহাসনে আরোহণ করেন? সম্রাট অশোকের স্বভাব কেমন ছিল বর্ণনা কর।

Content added By

কলিঙ্গ যুদ্ধে জয়ী হলেও সম্রাট অশোক সুখী হলেন না। রাজ্য জয়ের বিনিময়ে দেখলেন রক্তপাত এবং মৃত্যুর বিভীষিকা। কলিঙ্গ যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি দারুণভাবে মর্মাহত হন। অনুতাপ আর অনুশোচনায় ভীষণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি চিন্তা করতে লাগলেন: আমি কী করেছি? এটি জয় নাকি পরাজয়? একি ন্যায় নাকি অন্যায়? একি বীরত্ব নাকি চরম পরাজয়? নিরপরাধ শিশু এবং নারীদের হত্যা করা কি বীরের কাজ? অন্য রাজ্য ধবংস করে কি নিজ রাজ্যের সমৃদ্ধি করা যায়? কেউ স্বামী, কেউ পিতা, কেউ সন্তান হারিয়ে হাহাকার করছে-এসব মৃত্যু ও ধবংসযজ্ঞ কি জয় নাকি পরাজয়? একদিন তিনি রাজপ্রাসাদের সিংহদ্বারে দাঁড়িয়ে এরূপ চিন্তা করছিলেন এবং পাটলিপুত্রের শোভা দেখছিলেন। মনে ছিল অশান্তি ও ভাবাবেগ। এমন সময় সৌম্য, শান্ত ও সংযত সাত বছরের এক শ্রমণ ধীর গতিতে রাজ অঙ্গন দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকে দেখামাত্রই সম্রাট অশোকের মনে শ্রদ্ধা জেগে উঠে। তাঁর নাম নিগ্রোধ শ্রমণ। তিনি ছিলেন বিন্দুসারের প্রথম পুত্র যুবরাজ সুমনের সন্তান। অর্থাৎ সম্রাট অশোকের ভ্রাতুষ্পুত্র। সম্রাট অশোক নিগ্রোধ শ্রমণকে ডেকে আনবার জন্য এক অমাত্যকে পাঠালেন। শ্রমণ ভিক্ষা পাত্র নিয়ে ধীর গতিতে প্রাসাদে এলেন এবং নিজেকে বুদ্ধের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিলেন। সম্রাট অশোক তাঁর মুখে বুদ্ধের অমৃতময় ধর্মবাণী শুনতে চাইলেন।

নিগ্রোধ শ্রমণ ধম্মপদ গ্রন্থের 'অপ্রমাদ বর্গের' একটি গাথা সম্রাট অশোককে ব্যাখ্যা করে শোনান। গাথাটির মর্মকথা হলো: 'অপ্রমাদ অমৃত লাভের পথ, আর প্রমাদ মৃত্যুর পথ। অপ্রমত্ত ব্যক্তিরা অমরত্ব লাভ করেন, কিন্তু যারা প্রমত্ত তারা বেঁচে থেকেও মৃতবৎ। এই সত্য বিশেষরূপে জেনে যাঁরা অপ্রমত্ত হয়ে আর্যদের পথ অনুসরণ করেন, সেই ধ্যাননিষ্ঠ, সতত উদ্যোগী, দৃঢ়পরাক্রমশীল, বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ পরম শান্তিরূপ নির্বাণ লাভ করেন।' বুদ্ধের এই ধর্মবাণী শোনা মাত্রই সম্রাট অশোকের হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে উঠল। এ গাথার মাধ্যমে তিনি বুদ্ধের ধর্মের মর্মবাণী উপলব্ধি করেন। অতঃপর তিনি নিগ্রোধ শ্রমণের কাছেই বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন। পরিণত হন বৌদ্ধ উপাসকে। সেদিন থেকেই তাঁর রাজ্য জয়ের পরিবর্তে মানুষের অন্তর জয় করার বাসনা হয়। দিগ্বিজয়ের প্রবল তৃষ্ণা মন থেকে মুছে ফেলেন। রাজ্য জয়ের পরিবর্তে ধর্মবিজয়কে তিনি সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রজাদের কল্যাণে সর্বদা নিবেদিত থাকতেন। সকলের প্রতি দয়াশীল আচরণ করতেন। সর্বপ্রাণির প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম মমত্ববোধ। তিনি অহিংসা, সত্য, ন্যায়পরায়ণতা, দান, সেবা প্রভৃতি আদর্শকে রাষ্ট্রনীতিতে গ্রহণ করে রাজ্য শাসন করতেন। বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর তিনি 'চণ্ডাশোক' থেকে 'ধর্মাশোকে' পরিণত হন। তিনি 'দেবনাম প্রিয়দর্শী' উপাধি লাভ করেন। দেবতাদের প্রিয় ছিলেন এবং সকলকে স্নেহ-মমতার দৃষ্টিতে দেখতেন বলে তিনি এরূপ উপাধি লাভ করেন।

অনুশীলনমূলক কাজ
সম্রাট অশোক কার নিকট এবং কেন বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন?
চন্ডাশোক কে ছিলেন? তাঁকে কেন চণ্ডাশোক বলা হতো এবং তিনি কীভাবে চন্ডাশোক থেকে ধর্মাশোকে
পরিণত হলেন?

Content added By

বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারে সম্রাট অশোকের অবদান সর্বজন স্বীকৃত। ধর্ম প্রচারক হিসেবে তাঁর খ্যাতি পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি মৌর্য সম্রাটগণের চিরাচরিত প্রমোদ ভ্রমণ বন্ধ করে দেন। তার পরিবর্তে সর্বপ্রাণীর কল্যাণ কামনায় তিনি বুদ্ধের বাণী প্রচার ও তীর্থ ভ্রমণের জন্য ধর্মযাত্রার ব্যবস্থা করেন। ধর্ম প্রচারের জন্য 'ধর্মমহামাত্র' নামে এক বিশেষ শ্রেণির রাজকর্মচারি নিযুক্ত করেন। তাঁরা নগরে প্রান্তরে সর্বত্র ধর্মনীতি প্রচার করতেন। তিনি প্রজাদের ধর্মশিক্ষার জন্য স্থানে স্থানে, পর্বতগাত্রে, প্রস্তর স্তম্ভে ধর্মবাণীসমূহ খোদিত করান। নিজেও বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দর্শনে যেতেন। কথিত আছে, সম্রাট অশোক বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ স্মরণীয় করে রাখার জন্য চুরাশি হাজার বিহার, চৈত্য, স্তূপ ও স্তম্ভ নির্মাণ করান। বিহারের জন্য ভূমি দান করেন।

সম্রাট অশোকের সময়ে বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ভিক্ষু শ্রমণের লাভ-সৎকার বৃদ্ধি পায়। তখন অন্যান্য সম্প্রদায়ের তীর্থিক সন্ন্যাসীগণ ভিক্ষুর ছদ্মবেশ ধারণ করে সংঘে প্রবেশ করে সুযোগ-সুবিধা লাভকরতে থাকেন। তাঁরা বৌদ্ধ বিনয় বিধান মানতেন না। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন না। সর্বদা ভোগবিলাসে মত্ত থাকতেন। নিজেদের মতবাদ বুদ্ধবাণী হিসেবে প্রচার করতেন। তাঁদের দাপটে ধর্মপ্রাণ ভিক্ষুগণ কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ফলে সংঘে অরাজকতা দেখা দেয়। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ধর্মপ্রাণ ভিক্ষুগণ অবিনয়ী ছদ্মবেশধারী ভিক্ষুদের সঙ্গে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। এ কারণে পাটলীপুত্রে দীর্ঘদিন উপোসথ বন্ধ ছিল। সম্রাট অশোক এ খবর শুনে খুবই অসন্তুষ্ট হন। তিনি ভিক্ষুদের উপোসথ পালন করানোর জন্য অমাত্যকে নির্দেশ দেন। বিনয়ী ভিক্ষুগণ অবিনয়ী ভিক্ষুদের সঙ্গে উপোসথ পালন করতে অস্বীকৃতি জানালে অমাত্য বহু বিনয়ী ভিক্ষুর প্রাণসংহার করেন।

এ খবর শুনে সম্রাট অশোক খুবই মর্মাহত হন। মূর্খ অমাত্যের হত্যাজনিত পাপের জন্য তিনি ভিক্ষুসংঘের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি মোগলীপুত্র তিষ্য থের'র নিকট প্রকৃত বুদ্ধ মতবাদ জ্ঞাত হয়ে অবিনয়ী ছদ্মবেশধারী ভিক্ষুদের সংঘ হতে বহিষ্কার করেন। সংঘ পুনরায় বিশুদ্ধ হয়। সংঘে পুনরায় শান্তি ফিরে আসে। তারপর বিনয়ী ভিক্ষুগণ একত্রিত হয়ে উপোসথ পালন করেন। অতঃপর পুনরায় বুদ্ধের ধর্মবাণী সংগ্রহের জন্য পাটলীপুত্রের অশোকারামে তৃতীয় সঙ্গীতির আহবান করেন। এ সঙ্গীতিতে মোগলীপুত্র তিষ্য থের'র নেতৃত্বে বুদ্ধবাণী সংগৃহীত হয়। মোগলীপুত্র তিষ্য থের ভিন্নমতাবলম্বীদের মতবাদ খন্ডনের নিমিত্তে এই সঙ্গীতিতে 'কথাবন্ধু' নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। বুদ্ধবাণীর সার প্রতিফলিত হওয়ায় গ্রন্থটি ত্রিপিটকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তৃতীয় সঙ্গীতির পর সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারের জন্য কাশ্মীর, গান্ধার, মহিষমণ্ডল, বনবাস, অপরান্ত, মহারাষ্ট্র, যোন, হিমবন্ত প্রদেশ, সুবর্ণভূমি এবং লঙ্কাদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কায় ধর্মদূত প্রেরণ করেন। তিনি নিজের পুত্র মহেন্দ্রকে ভিক্ষু এবং কন্যা সংঘমিত্রাকে ভিক্ষুণী ধর্মে দীক্ষা দান করেন এবং শ্রীলঙ্কায় ধর্ম প্রচারের জন্য প্রেরণ করেন। তাঁদের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম প্রচার-প্রসার লাভ করে। সম্রাট অশোক শ্রীলঙ্কায় পবিত্র মহাবোধির শাখাও প্রেরণ করেন। এভাবে সম্রাট অশোকের অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্ম ভারতের সীমারেখা অতিক্রম করে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।

অশোক স্তম্ভ

সম্রাট অশোক নিজে যেমন ধর্মপ্রাণ ছিলেন তেমনি প্রজাদেরও ধর্মপ্রাণ হতে নির্দেশ দিতেন। তিনি প্রজাদের ধর্মবোধ জাগ্রত করতে সমগ্র রাজ্যের পর্বত গাত্রে, স্তম্ভে এবং শিলালিপিতে বুদ্ধবাণী লিখে রাখতেন।

ধর্মবাণী প্রচারের মাধ্যমে তিনি মানুষের নৈতিক উৎকর্ষ সাধন করতে চেয়েছিলেন। তাঁর অনুশাসনে উল্লেখ আছে: 'ধর্ম প্রচার অতি শ্রেষ্ঠ কর্ম। দুঃশীলের পক্ষে ধর্মদান ও ধর্মাচরণ অসম্ভব। ধর্মাচরণের শ্রেষ্ঠত্ব ও বৃদ্ধি কাম্য। এ লক্ষ্য প্রসারিত হোক।'

সম্রাট অশোক ছিলেন আদর্শ নরপতি ও মহৎ প্রাণের মানুষ। তিনি নিজের সুখভোগ ত্যাগ করেছিলেন। প্রজাদের কল্যাণ সাধনই ছিল তাঁর ব্রত। অসাধারণ কর্মবীর, শাসনপটু, ধার্মিক ও মানব হিতৈষী নরপতি সম্রাট অশোক ছত্রিশ বছর রাজত্ব করে খ্রিষ্টপূর্ব ২৩২ অব্দে মৃত্যুবরণ করেন। বৌদ্ধধর্মের শ্রেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক এবং দানবীর হিসেবে তিনি বিশ্বের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

অনুশীলনমূলক কাজ
সংঘ কীভাবে বিশুদ্ধ হয়েছিল?
সম্রাট অশোক যেসব রাজ্যে ধর্মপ্রচারক প্রেরণ করেছিলেন তার একটি তালিকা প্রস্তুত কর।

Content added By

সম্রাট অশোক মহৎ প্রাণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর সৃজনশীল প্রতিভা, দয়াপরায়ণতা ও উদারতার কারণে তিনি শ্রেষ্ঠত্বের আসন লাভ করেন। তিনি অত্যন্ত পরমত সহিষ্ণু ছিলেন। তিনি শুধু বৌদ্ধধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাসম্পন্ন ছিলেন না, অন্যান্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের প্রতিও ছিল তাঁর প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি। তিনি ব্রাহ্মণ, জৈন ও আজীবকদেরও শ্রদ্ধা এবং পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাঁদের দান দিতেন। তিনি নৈতিক আচরণের নীতিসমূহকে সকল ধর্মের সার বলে মনে করতেন। এসব নীতিকে তিনি ভারতবর্ষের সর্বজনীন নীতি হিসেবে সকলের পালনীয় মনে করতেন। তাঁর প্রচারিত নীতিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল: পিতা-মাতা ও গুরুজনদের প্রতি অনুগত থাকবে, জীবিত প্রাণীদের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি প্রদর্শন করতে হবে, সত্য কথা বলতে হবে। নৈতিক ধর্ম হিসেবে এগুলো মানুষকে অনুসরণ করতে হবে। সে যুগে বিভিন্ন ধর্মমতের অনুসারীরা নিজ ধর্মকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম মনে করতেন। ফলে তাঁদের মধ্যে বিদ্বেষভাব চরম আকার ধারণ করেছিল। সম্রাট অশোক পরমত সহিষ্ণুতার নীতি অনুসরণ করে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ধর্মানুসারীদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি পরমত সহিষ্ণুতা এবং ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মৈত্রীময় সম্পর্ক সৃষ্টি করে সমগ্র ভারতবর্ষে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তিনি বলতেন, পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। পরধর্মের সমালোচনা করবে না।

সম্রাট অশোকের কল্যাণে ভারতবর্ষে সেদিন ধর্মীয় সম্প্রদায়সমূহের মধ্যে মিলনের যে ধারা সৃষ্টি হয়েছিল তা আজও সকল ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সহাবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখতে উদ্বুদ্ধ করে।
সম্রাট অশোক বিখ্যাত ও বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি শাসনতন্ত্রে বৌদ্ধধর্মকে ব্যবহার করে বিশ্বজয় করেছিলেন। তাঁর রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতি ও ধর্মনীতি সত্যিকার অর্থে মানব কল্যাণে নিবেদিত ছিল। তিনি কেবল মানুষের কল্যাণ সাধনেই ব্যস্ত ছিলেন না, সকল প্রাণী ও প্রকৃতির কল্যাণের জন্যও গ্রহণ করেছিলেন নানা উদ্যোগ। পরিবেশ সুরক্ষায় এবং ওষুধের প্রয়োজনে তিনি তাঁর রাজ্যের সর্বত্র গাছ লাগানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। তাঁর রাজ্যে প্রয়োজনীয় গাছ না থাকলে তিনি অন্য রাষ্ট্র থেকে এনে রোপণের ব্যবস্থা করতেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে জনসাধারণের পিপাসা নিবারণের জন্য আট ক্রোশ অন্তর তিনি কূপ খনন করেছিলেন। সর্বজনীন কল্যাণ ও মঙ্গল সাধনাই ছিল তাঁর মূল উদ্দেশ্য।

অনুশীলনমূলক কাজ
পরধর্মের প্রতি সম্রাট অশোকের মনোভাব কেমন ছিল?

Content added By

শূন্যস্থান পূরণ কর

১. বিন্দুসারের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ______ সিংহাসনে আরোহণ করেন।

২. রাজ্যজয়ের বিনিময়ে _____ এবং _____ ।

৩. সম্রাট অশোক _______ শ্রমণের দেখলেন ______ দীক্ষা নেন।

৪. সম্রাট অশোক শাসনতন্ত্রে ______ ব্যবহার করে বিশ্বজয় করেছিলেন।

মিলকরণ

বামডান
১. কলিঙ্গযুদ্ধের বিভীষিকা দেখে তিনিধর্মাশোক নামে খ্যাত হন
২. মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেনঅনুষ্ঠিত হয়
৩. বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর চন্ডাশোকশাখাও প্রেরণ করেন
৪. পাটলীপুত্রের অশোকারামে তৃতীয় সঙ্গীতিবৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন
৫. সম্রাট অশোক শ্রীলঙ্কায় পবিত্র মহাবোধিরচন্দ্রগুপ্ত

সংক্ষিপ্ত-উত্তর প্রশ্ন

১. যুবরাজ অশোক কীভাবে শৌর্য বীর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন?
২. ধর্মমহামাত্র নামের এক বিশেষ শ্রেণির রাজকর্মচারী কী কাজ করতেন?
৩. সম্রাট অশোক কীভাবে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও ধর্মানুসারীদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?

বর্ণনামূলক প্রশ্ন

১. সম্রাট অশোকের কলিঙ্গ বিজয় ও বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের কাহিনি বর্ণনা কর।
২. বৌদ্ধধর্ম প্রচার প্রসারে সম্রাট অশোক কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন লেখ।
৩. অন্যান্য ধর্মের প্রতি সম্রাট অশোকের মনোভাব কী ছিল বর্ণনা কর।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

১. সম্রাট অশোকের পিতার নাম কী?

ক. চন্দ্রগুপ্ত
খ. বিন্দুসার
গ. গোপালচন্দ্র
ঘ. বিম্বিসার

২. সম্রাট অশোক কত হাজার চৈত্য বা স্তম্ভ নির্মাণ করেন?

ক. ৮০,০০০
খ. ৮১,০০০
গ. ৮২,০০০
ঘ. ৮৪,০০০

৩. নিগ্রোধ শ্রমণ সম্রাট অশোকের কে হন?

ক. ভ্রাতুষ্পুত্র
খ. কনিষ্ঠ্য পুত্র
গ. শিষ্য
ঘ. ভ্রাতা

নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং ৪ ও ৫ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দাও

রাজা ধর্মপাল ধর্মবিদ্বেষী ছিলেন না। তিনি সকল ধর্মের ও মতের অনুসারীদের নিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

৪. রাজা ধর্মপালের সাথে নিচের কোন শাসকের মিল পাওয়া যায়?

ক. রাজা বিম্বিসার
খ. সম্রাট কণিষ্ক
গ. সম্রাট অশোক
ঘ. রাজা মহাকশ্যপ

৫. উক্ত শাসকের ধর্মীয় মতের সঙ্গে রাজা ধর্মপালের অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পিছনে নিহিত ছিল-
i. সাম্রাজ্যের সুদৃঢ়তা প্রতিষ্ঠা
ii. সকল ধর্মানুসারীর মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা
iii. প্রচুর ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান করা।
নিচের কোনটি সঠিক?

ক. i ও ii
খ. ii ও iii
গ. i ও iii
ঘ. i, ii ও iii

সৃজনশীল প্রশ্ন

১. রাজা জনবম এক সাহসী ও নির্দয় শাসক ছিলেন। তিনি নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে এবং নতুন রাজ্য জয় করতে গিয়ে সেখানে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেন। অবসরে তিনি যখন সেই হত্যাকান্ডের কথা ভাবতে লাগলেন ঠিক তখনই এক সন্ন্যাসীকে দেখে তার সাথে কথা বললেন। সন্ন্যাসীর কথা শুনে রাজার মধ্যে ধর্মের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি হলো। অতঃপর ধর্মীয় বাণী প্রচারের জন্য তিনি রাজ্যের সর্বত্র উক্ত বাণী লিখে প্রজাদের মধ্যে ধর্ম চেতনা উৎপন্ন করলেন। এর পর থেকে রাজা জনবম রাজ্য জয়ের চেয়ে ধর্ম প্রচারের প্রতি বেশি মনোযোগী হলেন এবং মনে করলেন রাজ্য জয়ের চেয়ে ধর্ম প্রচার অতি শ্রেষ্ঠ কর্ম।

ক. মগধ বর্তমানে ভারতের কোন রাজ্যে অবস্থিত?
খ. 'অপ্রমাদ অমৃত লাভের পথ আর প্রমাদ মৃত্যুর পথ' ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকে বর্ণিত রাজা জনবমের কর্মকান্ডে বৌদ্ধধর্মের কোন রাজার সঙ্গে মিল রয়েছে? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. 'রাজ্য জয়ের চেয়ে ধর্ম প্রচার অতি শ্রেষ্ঠ কর্ম'-রাজা জনবমের বক্তব্যটির সঙ্গে তুমি কী একমত? পাঠ্যপুস্তকের আলোকে ব্যাখ্যা কর।

২. বিনয় বড়ুয়া নিজ অর্থ ব্যয়ে অনাথ-অসহায়দের ভরণ-পোষণ ও ধর্ম শিক্ষার জন্য একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। বিনামূল্যে ও বিনা পরিশ্রমে আহার এবং অন্যান্য সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার জন্য অনেক ভন্ড ব্যক্তি পরিচয় গোপন করে আশ্রমে যোগ দিলেন। একপর্যায়ে ভণ্ড ব্যক্তিরা অনাথ-অসহায়দের ওপর নির্মম নির্যাতন চালাতেন। এতে আশ্রমে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে বিনয় বাবু প্রকৃত সত্য নির্ণয় করে ভন্ডদের বের করে দেন। ফলে আশ্রমটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেল।

ক. সম্রাট অশোক কার কাছে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হন?
খ. সম্রাট অশোক 'চণ্ডাশোক' থেকে 'ধর্মাশোকে' কীভাবে পরিণত হলেন?
গ. বিনয় বড়ুয়ার কাজের সাথে সম্রাট অশোকের কোন ঘটনার সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে-ব্যাখ্যা কর।
ঘ. আশ্রম রক্ষায় বিনয় বড়ুয়ার কাজটি সম্রাট অশোকের কার্যাবলির প্রতিচ্ছবি-উক্তিটির যথার্থতা বিশ্লেষণ কর।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...